Followers

Tuesday, November 26, 2024

মুন ইউটিউবার

মুন কয়দিন ধরে ঠিক করতেই পারছেনা  যে, ইউটিউবে পরবর্তী কনটেন্ট টা কি হবে। অনেক চিন্তা ভাবনা করে মাথার মধ্যে একটা আইডিয়া আসলো যে, সে চাল কুমড়োর মোরব্বা তৈরি করবে এবার। যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। ওদের গোয়াল ঘরে টালির চালে কয়েকটা চাল কুমড়ো পেকে রয়েছে অনেক দিন। সাধারণত পাকা চাল কুমড়ো গুলো এই ভাবেই ঘরের চালে রেখে দেয়া হয়। সময়মতো ওগুলো পাড়া হয় বিভিন্ন কাজে।

মুন একটা বাঁশের  মই যোগাড় করে গোয়াল ঘরের টালির চালে সে নিজেই উঠে পড়ল। প্রায় ১০ কিলো ওজনের একটা ইয়া বড় পাকা সাদা চাল কুমড়ো কেটে দুই হাত দিয়ে তুলে কোলে নিলো। তারপর চাল কুমড়োটা সহ আস্তে আস্তে সে চালের থেকে নামতে শুরু করলো। কিন্তু ভীষণই দুর্ভাগ্য তার, হঠাৎ করে চাল কুমড়োটা হাত থেকে ফসকে টালির চালের পরে সজোরে পড়ে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গেই পট পট করে টালি গুলো ভেঙ ধম করে পড়লো চাল কুমড়োটা নিচে। মুন ও সঙ্গে সঙ্গে ব্যালেন্স না রাখতে পেরে ধপ করে গোয়াল ঘরের মধ্যে  করে পড়ে গেল।

মুন পড়ে যেতেই সে চিৎকার করতে শুরু করল ও বাবা ও মা আমাকে বাঁচাও আমি পড়ে গেছি দেখো ।আমার কি হয়েছে। হঠাৎ করে বিকট শব্দে ও মুনের চিৎকারে সবাই ছুটে আসলো আতঙ্কে। দেখলো মুন গোয়াল ঘরের মধ্যে পড়ে আছে। গায়ে রক্ত লেগে । আর কান্না করছে। বাড়ির সকলে মুনের পুড়ে যাওয়াতে হতভম্ব হয়ে গেল। তারা কি করবে ভেবে পাচ্ছিল না তৎক্ষণাৎ। কিছুক্ষণ পরে অবশ্য সম্বিত ফিরতেই তড়িঘড়ি করে মুনকে নিয়ে গেল হাসপাতালে। 

হাসপাতালে ভর্তি হতেই ডাক্তারবাবু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানালো আঘাত বেশ গুরুতর। সম্ভবত পা ফ্র্যাকচার ও হতে পারে। পরে ডাক্তারবাবুর নির্দেশ মতো মনের পা এক্স রে করানো হলো। এক্সরে তে দেখা গেল ডান পায়ের পাতার হাড়ে ফ্র্যাকচার ধরা পড়েছে। মুনকে নিয়ে যাওয়া হল ভালো নার্সিংহোমে। সেখানে মুনের ডান পায়ের প্লাস্টার করানো হলো। মুনকে ভর্তি করে রেখে সকলে একটু স্বস্তি পেল। 

প্রায় দুদিন পর মুনের শরীরটা একটু ভালো বোধ হল। শেষ পর্যন্ত স্বাভাবিক খাওয়া-দাওয়া শুরু করেছে। কিন্তু চোখমুখে এখনো ভয় এবং আতঙ্কের রেশ রয়ে গেছে। একে একে সবাই দেখতে আসছে তাকে। মুন ও টুকটাক তাদের সঙ্গে কথাও বলছে। মুনের যে মাথায় গুরুতর আঘাত লাগেনি এই কথা সকলেই বারে বারে বলতে লাগলো।।

বিকেল বেলার ভিজিটে মুনের মা তাকে দেখতে আসলে মুন মাকে বললো "মা তুমি আমার মোবাইলটা একটু এনে দেবে?" 
মা বললো "কেন রে? তুই এখন মোবাইল দিয়ে কি করবি "।
"তুমি বুঝতে পারছ না, এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল ফলোয়ারদের জানাতে হবে না? এমনিতেই অনেকে ফোন করছে। হয়তো। আমার এই অবস্থা জানলে তারা ভীষণই কষ্ট পাবে।

 আমাকে তাদেরকে একটু আশ্বস্ত করতে হবে ।আপডেট দিতে হবে।।"
মুনের মা বললো " মোবাইলটা আমার সঙ্গেই আছে তুই নিতে পারিস। সবকিছু হবে আগে তুই তাড়াতাড়ি একটু সুস্থ হয়ে নে। ভাঙা পা নিয়ে কতদিন ঘুরতে হবে কে জানে। কালকেই তোকে ছেড়ে দেবে ।এক সপ্তাহ পরে চেকআপে আবার আসতে হবে।"

এই নে তোর ফোন। এখন কাছে রেখে দে। 
কিছুক্ষণ মায়ের সঙ্গে কথাবার্তার পর ওর মা চলে গেল। 

মুন একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মোবাইলটা অন করলো। নিজের ইউটিউবের একাউন্ট খুলে রিল তৈরি করতে শুরু করলো। 
পোস্টে বললো, হাই গাইস, এই দেখো আমার কি অবস্থা হয়েছে ।তোমাদের জন্য চাল কুমড়ার মোরব্বা তৈরি করতে গিয়ে আমার এই হাল হয়েছে। মাথায় লেগেছে বুকে লেগেছে রক্ত বেরিয়েছে পা ভেঙেছে, অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম। প্রায় মর মর অবস্থা হয়েছিল আমার। ঠাকুরের ইচ্ছায় এবং আপনাদের আশীর্বাদ এবং ভালোবাসায় আমি এখনো বেঁচে আছি। আপনাদের অশেষ সহযোগিতা ও ভালোবাসা না থাকলে আমি আজ বেঁচে উঠতেই পারতাম না।। আমি খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে এবং আবারো আমি নিজেই টালির ছাদে উঠে চাল কুমড়ো পেড়ে ,চাল কুমড়ার মোরব্বা করে দেখা বই দেখাবো। 
আশাকরি আপনারা সকলে আমার পাশে থাকবেন আমাকে আশীর্বাদ করবেন যাতে করে আমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠতে পারি এবং তাড়াতাড়ি রিল তৈরি করতে পারি। যদিও সামনে আমার পরীক্ষা রয়েছে, জানি অনেক ক্ষতি হয়ে গেল কিন্তু চাল কুমড়োর মোরব্বা একটি অসাধারণ রেসিপি। এটাকে কখনোই অবজ্ঞা করা যায় না। হাই গাইস ,আজকে আর বেশি কথা বলবো না ,দেখতেই তো পাচ্ছ আমার কি অবস্থা !। সকলে ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন আর চাল কুমড়ো রেসিপির জন্য কোন পরামর্শ থাকলে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন।"
মুন তারপর এই আপডেট পোস্ট করে দিয়ে নিশ্চিন্তে চোখ বুজে ঘুমিয়ে পড়ল। 

পরেরদিন মুন সকালের চোখ মেলে দেখে, কাচের জানালা দিয়ে হুড় হুড় করে ভোরের আলো ঢুকছে তির্যক ভাবে। ঘুঘু ডাকছে এক নাগাড়ে। মনটা খুশিতে ভরে গেলো। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের প্লাস্টার লাগানো পা টা দেখেই ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো মুন। আজকে মুনের ছুটি হয়ে যাবে।
 সে বাড়ি ফিরে যাবে বিকালে। মুন বালিশের তলা থেকে নিজের মোবাইলটা বের করে তার অ্যাকাউন্টের আপডেট দেখতে শুরু করল। কিন্তু একি !এ তো দেখছি হাজার হাজার কমেন্টস। খুশিতে ভরে গেল তার মন। মোটামুটি কমেন্টসগুলোর সারমর্ম এই যে , ফলোয়ার  বলছেন, দিদি আপনি যত তাড়াতাড়ি পারুন সুস্থ হয়ে উঠুন ।আমরা আপনার পিছনে আছি, সবাইকে আমরা জানিয়ে দিয়েছি শেয়ার করে এই ব্যাপারটা। আমাদের সবুজ মুক্তি সংঘ এ ব্যাপারে একটা মিটিংও ডেকেছে। আপনার কোন সহযোগিতা লাগলে আর  ও অন্যকোন যেকোনো সাহায্য লাগলে আমাদের অবশ্যই জানাবেন। আমরা আপনার পিছনে সর্বদা আছি ।আপনি সুস্থ হয়েই আমাদের চাল কুমড়ো রেসিপি টা অবশ্যই বানিয়ে দেখাবেন। আপনি ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন। মুনদি জিন্দাবাদ ,আমরা আছি ও থাকবো। মুন তো কমেন্টগুলো পড়ে ভীষণই খুশি ।তার সব পা ব্যথা নিমেষেই উবে গেল।


এইভাবে প্রায় মন ২ মাস ধরে ডাক্তারবাবুর ওষুধ খেয়ে এক্সারসাইজ করে মোটামুটি সুস্থ হয়ে উঠলো। প্লাস্টার খোলা হয়ে গেছে কিছুদিন আগে ।এখন সে হাঁটাহাঁটি করতে শুরু করেছে। আর ভাবছে, কখন সে চাল কুমড়োর রেসিপিটা তৈরি করবে। চাল কুমড়ো রেসিপি তৈরি হয়ে গেলেই সে একটা আপডেট দেবে। 

মুন আপাতত বাজার থেকে একটা চাল কুমড়ো কিনে এনে চাল কুমড়ো মোরব্বা তৈরি করার মহড়া শুরু করল। চাল কুমড়ো গুলো ডুমো ডুমো করে কেটে, ফুটো ফুটো করে চুনের জলে ভিজিয়ে, পরিষ্কার করে চিনির জলে ভিজিয়ে মোরব্বার তৈরির প্র্যাকটিস করল। কিন্তু যতবারই সে মোরব্বা তৈরি করতে যাচ্ছে ততবারই মোরব্বা না হয়ে ঠিক জেলির মত হয়ে যাচ্ছে। বাজার থেকে যে ফেরিওয়ালার কাছ থেকে সে চাল কুমড়ার মোরব্বা এনেছিল তার মত হচ্ছে না। ভাবছি এরকম মোরব্বা বানালে তো আমাকেই সকলে ই উল্টোপাল্টা বলবে। 

যাইহোক বেশ কয়েকবার চেষ্টার পরে ফল মিলল। সে একদিন চাল কুমড়ার মোরব্বা রেসিপি নিজের একাউন্টে পোস্ট করল। 
চাল কুমড়ো রেসিপি দেখে তো হাজার হাজার ফলোয়ার্স আনন্দে আত্মহারা। হাজার হাজার কমেন্টস আসছে।

মুন আমাকে প্রায়ই বলতো, "ডাক্তার কাকু, আপনার কি ৫ ০০ ফলোয়ার্স হয়েছে ?আমার তো প্রায় ৫০ হাজার হতে চলল। "
আমি বললাম "দেখো মা ,আমি ফলোয়ার্সের আশা আর করি না এই মাঝেমধ্যে টুকটাক পোস্ট করি এই অব্দি। মুন এই কথা শুনে একগাল হেসে বলতো "হবে হবে ,আপনার হবে অনেক ফলোয়ার্স হবে একদিন। "

এর মধ্যে  হয়েছে কি , মুন কে নিয়ে কেউ রোস্ট করেছে যে  মুন নিজে আর টালির চালে উঠে চাল কুমড়ো পেড়ে আনেনি, বাজার থেকে মোরব্বা কিনে এনে সবাইকে দেখিয়েছে। আসলে মুন আমাদের সঙ্গে এক প্রকার প্রতারণায় করেছে। 


 এই রোস্ট দেখে,মুন তো খেপে লাল। সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা পোস্ট করল সে। এইভাবে পোস্ট তার পাল্টা পোস্ট চলল কিছু কিছু দিন।

কিছুদিন পরে মুন ভীষণই একটা বড় পোস্ট করল । 
বলল হাই গাইস, আজকে একটা বিশেষ খবর জানাবো তোমাদের।  তোমাদের সবাইকে অবাক করে দেবো। আমি আজকে আমার  ছোটবেলা থেকেই দেখা স্বপ্ন ও ইচ্ছা তাকে বিসর্জন দেব। আমি  আর ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখছি না। ওডিসি নাচ বাদ দিয়ে দিয়েছি। আমি এখন বড় ইউটিউবার হতে চাই। নানান ধরনের রেসিপি আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। যদিও মা আমাকে সব সময় বলতো, তুই বড় চাকরি করবি, কখনোই রান্নাবান্না করতে হবে না তখন। ভালো করে লেখাপড়া শেখো। আমি আর মায়ের কথা রাখতে পারলাম না। হাই গাইস ,এর জন্য আমাকে ক্ষমা করে দিও আমাকে তোমরা আগের মতই আশীর্বাদ ও ভালোবাসা দেবে। আমি এখন পুরনো বাড়িটা ছেড়ে নতুন বাড়ি কিনব বেহালায়। সেটাও তোমাদের আপডেট দেবো। তোমাদের সাপোর্ট আর ভালোবাসা না থাকলে আমি এই বাড়িটা কখনোই কিনতে পারতাম না মনে হয়। ভাগ্যিস আমার পা ট ভেঙে গেছিল।
 তাই জেদ এসেছিল যে আমাকে চাল কুমড়ো রেসিপি বানাতেই হবে।। আর এই জেদ আমাকে সাফল্যের চূড়ায় নিয়ে গেছে। চাল কুমড়ার মোরব্বা ভাইরাল হয়েছে। আপনারা থাকলে আমাকে আর ফিরে তাকাতে হবে না। দেখতেই তো পাচ্ছেন ডাক্তারি পড়ুয়ারা কিভাবে মার খাচ্ছে। কিভাবে অবহেলিত হচ্ছে । অধিকাংশ ডাক্তার বাবুরা কন্ট্রাকচুয়াল এ কাজ করেন। বছরের পর বছর তাদের কোন বেতনই বাড়ে না।সেই জন্য আর ডাক্তার হতে চাই না। চাল কুমড়া রেসিপিই ভালো। ওডিসি নাচ টা পায়ের ব্যথার জন্য আর করতেও পারবো না। আপনাদের জন্য সুখবর পরবর্তী আমার রেসিপি চালতা বেটে খুরমা চাটনি বানাতে হয় সেটা দেখাবো। আশা করি আপনারা ভিডিওটা দেখবেন। আজ এই অব্দি সকলে ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন। চাল কুমড়ো রেসিপি বাড়িতে বানিয়ে কেমন খেলেন জানাবেন।"

অনেক রাত্রে মুন এই পোস্টটা করে ঘুমিয়ে পড়ল। সারা আকাশ জুড়ে তারায় ভরে গেছে। নিস্তব্ধ রাত। মুনের জীবনের পুরনো স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হলেও নতুন স্বপ্নের সন্ধানে সে বিভোর। মুন যে একজন সফল ইউটিউবার । হাই গাইস ,ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

ডাঃ কাজল কুমার বক্সী
বগুড়া, নদীয়া 
২৬/১১/২০২৪









No comments:

Post a Comment

চটি চাটা

 নমস্কার ডাক্তার বাবু, বলছি এখানে কি হাঁস- মুরগির ওষুধ দেওয়া হয়? -- না-না, দেওয়া হয় না। পরের দিন আরেক জন। --আচ্ছা ডাক্তার বাবু , এখানে কি গর...