Saturday, November 16, 2024

নয়নতারা

এক যে ছিল এক গোয়ালিনী। তার তেমন কেউ ছিল না। থাকার মধ্যে ছিলএকটি কুকুর। তার  নাম বুকু।আর আছে দুটো গরু, নাম ধনু আর বুলু ।সে রোজ বিকেল বেলা  ঘরের জানালা খুলে ছোট্ট পুকুরের  বকের মাছ ধরা চেয়ে চেয়ে দেখতো এক মনে। গোয়ালিনীর নাম ছিল নয়নতারা দফাদার। রিংকু নয়নতারার বাড়িতে রোজ দুধ আনতে যেত। নয়ন তারা রিঙ্কুকে দেখলেই একগাল হাসিমুখে বলতো" কিরে রিংকু তুই দুধ খেয়েছিলি তো?রোজ তুই দুই পোয়া  করে দুধ খাবি আর বন্দুক নিয়ে যুদ্ধ করতে যাবি। জানিসতো  দুধ খেলে গায়ে খুব জোর হয় আর বুদ্ধিও বাড়ে "রিংকু এই কথা গুলো শুনলে একটু লজ্জা পেতো। মাথা নিচু করে হাসতো।তার পর  দুধ নিয়ে চলে যেত ধির  পায়ে। নয়ন তারার উঠোনের পাশে একটা বাতাবি লেবুর গাছ ছিল। ওই বাতাবি লেবুর গাছের সমস্ত ডালে ডালে ছোট ছোট সাদা ফুলে ভরে গেলে ফুলের গন্ধে বাড়িটা ম -ম করতো। মৌমাছি, কত রকমের প্রজাপতিরা দলে দলে উড়ে আসতো ।মধুর লোভে একেবারে মাতোয়ারা  হয়ে  যায় ।ইয়া বড় বড় বাতাবি লেবু গন্ডায় গন্ডায় ঝুলে ঝুলে থাকে। পাড়ার লোকেরা চেয়ে চেয়ে নিয়ে যায় মিষ্টি লেবুগুলো । নয়ন তারা মাঝে মধ্যেই উদাস হয়ে যায়। কেননা নয়নতারার স্বামী কয়েক  বছর হলো নিখোঁজ । কিছু বাড়তি পয়সার জন্য সে বোম্বাই গিয়েছিল কাজে। কিন্তু বছরখানেকের মাথায় ওর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি অনেক চেষ্টা চালিয়েও কোন সুরাহা হয়নি ।জলজ্যন্ত একটা মানুষটা কোথায় যে হারিয়ে গেল বোঝা গেল না ।নয়ন তারা এখনো তার ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকে, কত রকম সমস্যা ,ভয়ভীতি নিয়ে একা একাই বাড়িটা আগলে পড়ে আছে ।গ্রামের নানা জনের নানানরকম কথা, কুঁচাউনি বাঁচিয়ে গরু দুটো আর কুকুরটা নিয়ে বেঁচে আছে। 

রিংকু একদিন সত্যি সত্যিই দৌড়ঝাঁপ ,পড়াশোনা করে চাকরিতে জয়েন করলো।  সংবাদ শুনে নয়ন তারার তো  প্রায় পাগলের মতো অবস্থা। কখনো হেসে হেসে, কখনো কেঁদে কেঁদে সারা গ্রামের লোকের কাছে রিংকুর চাকরির কথা বলতে লাগলো ।আর তার গরুর দুধের সুখ্যাতির কথা জনে জনে ডেকে ডেকে জানালো। তার গরুর দুধ যারাই খেয়েছে তারাই নাকি ভালো আছে ভালো কিছু করছে। আর রিঙ্কু তো বড় চাকরিই পেয়ে গেছে। নয়ন তারা নিজে পায়েস রান্না করে রিংকুর বাড়িতে দিয়ে এসেছিল। দু-একদিনের মধ্যেই রিংকুর ধানবাদে যাবে নতুন চাকরিতে জয়েন করতে। 

নয়ন তারা তার গরু দুটো আর কুকুরটাকে নিয়ে সারাদিন খুবই ব্যস্ত থাকে। এরই মধ্যে চলে গেছে দু-তিনটি বছর। প্রায় তিন -চার বছর পরে রিংকু তাঁর দল বল ঝাড়খন্ড সীমান্তে কয়েকজনকে কি কারনে পাকড়াও করেছিল। রিঙ্কুকে দেখেই তাদের মধ্যে একজন কেমন যেন এক দৃষ্টিতে বড় বড় চোখ করে চেয়েছিল অনেকক্ষণ। রিংকু প্রথমে পাত্তা না দিলেও লোকটা ঐরকম অনেকক্ষণ ধরে চেয়ে আছে কেন ভাবতে লাগলো। লোকটার মুখে দাড়ি ভর্তি ।বেশ বড়সড়ো চেহারা, নাম বলেছে মোস্তাক্, বাড়ি বিহারে কিন্তু লোকটাকে খুবই চেনা চেনা লাগছে তার কাছে কিন্তু মেলাতে পারছে না কিছুতেই কারো সঙ্গে। রিঙ্কু অতি উৎসাহে তাকে বারে বারে জেরার পর প্রায় দিনের শেষে জানতে পারলো তার আসল পরিচয় ।সব কিছু জানার পরে সে তো থ বনে গেল ।,কি করবে ভেবে পাচ্ছিল না ।হাসবে না কাঁদবে না লাফাবে কোন কিছুই ভাবতে পারছিল না ।যাইহোক দাঁতে দাঁত চেপে সেদিন বিকেলেই নয়ন তারার কাছে সংবাদ দেয়া হলো যে তার স্বামীর খোঁজ পাওয়া গেছে । উনি যেন অবশ্যই ঝাড়খন্ডে চলে আসে, নিচে ঠিকানায়। সঙ্গে যেন কাউকে নিয়ে আসে্ন‌। নয়ন তারা তার স্বামীর খোঁজ পাওয়া গেছে শুনে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেনি ।সে যেন হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়ল কিন্তু রিংকুর কথা  অবিশ্বাস করবে বা কি করে ?প্রায় অজ্ঞান হয়েই শুয়ে পড়লো সে মাটিতে ।গ্রামের লোকেরা মাথায় জল টল দিয়ে ওকে সুস্থ করে পরের দিন ঝাড়খন্ডে যাওয়ার ব্যবস্থা করল। রিঙ্কু চাকরি করতে এসে নয়নতারা স্বামীকে যে সে খুঁজে পাবে সে কথা কখনো ভাবতেই পারেনি ।আজ বড্ড আনন্দের আর খুশির দিন কিন্তু নয়নতারা স্বামী কি কারনে বোম্বাই থেকে সোজা ঝাড়খন্ডে এসে চোরা চালানোর সঙ্গে যুক্ত  হল সেটা জানতে হবে তাকে। কতদিন বা জেল খাটতে হবে এরজন্য সে জানেনা।

নয়নতারা ঝাড় খন্ডে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে রইল সারাদিন ।সারারাত্রি ঘুম হয়নি চিন্তায় চিন্তায়। খুব ভোরে উঠেই ব্যাগ পত্র গুছিয়ে পাড়ার একটা ছেলেকে নিয়ে ঝাড়খন্ডে যাওয়ার জন্য স্টেশনের দিকে রওনা দিল। পাশের বাড়ির বৌদিকে বলে গেল ধলু আর বুলুকে  দেখতে। টিকিট কেটে নির্দিষ্ট সময়ে ট্রেনে উঠে পড়ল দুইজন।। কিছুতেই যেন সময় কাটছে না ।কখন আসবে ঝাড়খণ্ডের সেই জায়গায় যেখানে তার স্বামীকে পাওয়া গেছে। রিঙ্কু অপেক্ষা করছে তার জন্য। বলা আছে কোথায় তাকে নামতে হবে কোথায় যেতে হবে। একটা সময় পরে রিংকু ও গ্রামের ছেলেটা সেই জায়গায় পৌঁছে গেল। আনন্দে উত্তেজনায়, আশঙ্কায় তার গায়ে কাঁটা

 দিতে লাগলো। থরথর করে কাঁপছে যেন শরীরের ।পা যেন কিছুতেই নড়তে চাইছে না। তবুও কষ্ট করে সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখতে পেল একটা লোক বিএসএফের গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছে।। রিংকু নয়নতারা কে দেখে এক দৌড়ে  কাছে   এসে বলল" এসো এসো পিসি দেখো কে এসেছে? কাকে ধরে নিয়ে এসেছি। নয়নতারা চোখের জল ধীরে ধীরে অতি কষ্টে চেপে সেই লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। রিঙ্কু বলল" দেখো চিনতে পারছো কিনা। নয়ন তার স্বামীকে দেখেই চিনতে পারল কিন্তু এ কি চেহারা হয়েছে ।তা ছাড়া মুখে দাড়ি বড় বড় ।জামা লুঙ্গি পরা। নয়ন তারা স্বামী শুভ দফাদার স্ত্রীকে দেখে এক নিমেষে চিনতে পারল। মাথা নিচু করে বসে পড়ল মাটিতে ।চোখ দিয়ে জল বেরোচ্ছে কিন্তু কিছুই বলছে না। নয়নতারা বললে" তুমি এতদিন কোথায় ছিলে? কি করছিলে? কেন খোঁজ দাও নি আমার কোন খোঁজ নাওনি কেন ?আমার কি অবস্থা তুমি জানলে তুমি এভাবে থাকতে পারতে না। এখন কি হবে আমার। "

রিঙ্কু বলল" পিসি এখনই পিসেমশাই কে তুমি পাবে, না ওকে থানায় যেতে হবে। ওখানে নিয়ম-কানুন মেনে ওকে কিছুদিন থাকতে হতে পারে। তারপর আমি যা করার করব ও তো এখানে গরু চোরা চালানে যুক্ত ছিল ।পশ্চিমবঙ্গে গরু চোরাকারবারি রমরমা। সেই লোভে এদের সঙ্গে মুম্বাইয়ে যোগাযোগ হয়েছিল। অতিরিক্ত পয়সার লোভে এদের সঙ্গে ভিড়েছে গরু চোরা চালানে। আমাদের কাছে খবর ছিল । তাই ওদেরকে ধরতে পেরেছি কিন্তু এখন দেশের আইন মেনে ওকে থানায় নিয়ে যেতে হবে। 

এই কথা শুনে নয়নতারা হাউ হাউ করে কাঁদতে শুরু করল। রিঙ্কুকে হাতে-পায়ে ধরল। তুমি যত তাড়াতাড়ি পারো ওকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা কর ,না হলে আমি এখান থেকে কিছুতেই যাব না। রিঙ্কু তাঁর  অফিসারদের সঙ্গে কথা বলল। তারা বলেছেন ব্যাপারটা তারা দেখবে, যাতে ও তাড়াতাড়ি ছাড়া পায়। নয়নতারা ও তার স্বামীর সঙ্গে তেমন কিছু কথা হলো না ।কেউ কোন কথাই বলতে পারছে না ভালো করে ।কেবল একে অন্যের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে। 

কিছুক্ষণ পর ওরা সবাই গাড়িতে করে লোকাল থানায় চলে গেল।.সঙ্গে নয়নতারা। থানায় ওদের হ্যান্ড ওভার করে রিংকু নয়নতারা কে নিয়ে দ্রুত কোয়াটারে চলে আসলো। সারাদিন তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে ভালো খেতে দিয়ে আশ্বস্ত করলো যে তার স্বামীকে অর্থাৎ পিসেমশাইকে তাড়াতাড়ি ছাড়ানো ব্যবস্থা করবে সে। 

রিংকু তার পুরনো কথাগুলো নয়নতারা কে শোনালো। বলল "তুমি তো বলেছিলে, আমি যুদ্ধে যাব বন্দুক ্নিয়ে। আমার কাছেই দেখো রাইফেল আছে ।তোমাকে দেখাচ্ছি। আমি দেশ পাহারা দিই। আমার সঙ্গে অনেকে থাকে । অনেক মেয়ে আছে। তোমার দুধ না খেলে আমি এখানে আসতেই পারতাম না। তুমি আমার আপন পিসি না হলেও অনেক বড়। এখানে তুমি দু-একদিন থেকে তারপরে বাড়িতে যেও।" নয়ন তারা কাঁদতে কাঁদতে বলল "আমি যে ওকে খুঁজে পেয়েছি এটাই যথেষ্ট কিন্তু আমি এখানে থাকবো কি করে? আমার যে দুটো গরু আছে একটা কুকুর আছে । পাড়ার বৌদির কাছে রেখে এসেছি ।তাদের তাদেরকে কে খাওয়াবে ?কে দেখবে। তুমি শুধু ওকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা কর যত সম্ভব তাড়াতাড়ি। ও যাতে বাড়ি ফিরে যেতে পারে। আমি কালকে ভোরেই রওনা দেব বাড়ির উদ্দেশ্যে।" নয়নতারা স্বামী শুভ দফাদার। নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত সে কিন্তু সে ভালোভাবেই বুঝতে পারছে যে তাকে কিছুদিন জেল খাটতেই হবে। সেও এখন বাড়ি যাওয়ার জন্য উদগ্রীব ভয়ে পড়েছে। নয়ন তারাকে দেখে সে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছে না। 

নয়নতরা বাড়ি যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠলো । তার গরু দুটোর জন্য ধলু আর বুলু। ভোর হতে না হতেই বেরিয়ে পড়ল ট্রেন ধরার জন্য সেই ছেলেটিকে নিয়ে। তার আগের দিন স্বামীকে দেখে এসেছে একবার। রিঙ্কু স্টেশনে এসেছিল তাকে ছাড়তে। নয়ন তারা তাকে বলল  রিঙ্কু তুমি বাড়ি চলে এসো তোমার পিসে মশাইকে কে নিয়ে তাড়াতাড়ি ।তোমার জন্য আমরা অপেক্ষায় থাকবো।। কালো গরুর দুধ দিয়ে পায়েশ রান্না করে রাখবো। এই কথা বলে সে ট্রেনে উঠে বসলো। বলল রিঙ্কু তুমি দেশের জন্য লড়াই করবে যুদ্ধ করবে আমরা তোমার পিছনে আছি। আমার স্বামীকে খুঁজে দেয়ার জন্য তোমাকে অশেষ ধন্যবাদ ও আমার আশীর্বাদ রইল ।তুমি একদিন আরো বড় হবে। হর্ন বাজিয়ে ট্রেন ছেড়ে দিল। নয়নতারা আঁচল দিয়ে মুখ ঢাকল।রিংকু আর দেখতে পেল না নয়ন তারা কে। দুরন্ত গতিতে একটা মাল ট্রেন স্টেশন দিয়ে পাস হতেই স্টেশনের যত কাক ও শালিক তারা বাসায় উড়ে চলে গেল। সারা স্টেশন জুড়ে এখন শুধু নিস্তব্ধতা ও শূন্যতা । 





ডাঃ কাজল কুমার বক্সী     

বগুলা 

নাদিয়া১৫/১১/২০২৪

























 

No comments:

Post a Comment

তোমার কাছে

🎕🎕  তোমার কাছে বসবো নাতো আর, এই কথাটাই বলছি বারং বার। আমের মুকুল যতই পড়ুক ঝরে-- যতই হানো কঠিন তিরস্কার।              তোমার কাছে বসবো নাতো ...