😐😐
প্রশান্ত বাবু কলকাতা্র সন্নিকটেই এক পেল্লায় বাড়ি করেছেন। বাড়ি বললে একটু ভুলই হবে। ওটা একটা ডুপ্লেক্স সাজানো বাংলো। প্রায় সব ধরনের ফুলের ও অর্কিড গাছের ছড়াছড়ি ।এক কথায় অনবদ্য বাড়ির পরিবেশ।দিনের আলো পড়তে শুরু করলেই বাংলোর প্রতিটা নিয়ন বাতি গুলোর আলো ঝলমল
করে ওঠে ।স্বর্গীয় পরিবেশের ছোঁয়ায় প্রশান্তবাবু এক বুক প্রশান্তি নিয়ে ব্যালকনিতে বসে বিকালে চা খান তারিয়ে তারিয়ে প্রত্যেক দিন ।এ পাড়াতে তিনি প্রায় ১৫ বছর ধরে বসবাস করছেন ।বাংলোতে ওনার স্ত্রী এবং এক মেয়ে মোট তিনজনই থাকেন। প্রশান্ত বাবু নাম করা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ।বড় কোম্পানিতে দীর্ঘদিন ধরে তিনি চাকুরী করছেন।...বেশ অর্থশালী ও বটে ।বাড়ির সামনে দুই দুটো গাড়ি সাজানো থাকে ।
ওই পাড়ার স্থায়ী বাসিন্দা ডাক্তার অনিমেষ ব্যানার্জি বিখ্যাত জেনারেল সার্জেন । তিনি প্রত্যেকদিন এই পাড়ার চওড়া রাস্তা ধরে মর্নিং ওয়াক করেন। একদম সময় মেপে । প্রশান্তবাবু সঙ্গে ডাক্তার ব্যানার্জীর পরিচয় আছে বেশ ভালই ।মাঝেমধ্যে দেখা সাক্ষাৎ হলে ছোটখাটো নানান ধরনের কথাবার্তা হয়।
হঠাৎ একদিন ডাক্তার ব্যানার্জি প্রশান্ত বাবু কে জিজ্ঞাসা করলেন " আচ্ছা প্রশান্ত বাবু ,আপনার বাড়িতে তেমন কোন লোকজন বন্ধু-বান্ধব ,আত্মীয়-স্বজনকে আসতে দেখি না যে !কি ব্যাপার ? "
প্রশান্ত বাবু আস্তে হেসে বললেন "আমরা একটু ফাঁকা ফাঁকাই থাকতে পছন্দ করি। বেশি ঝুট ঝামেলা ভালো লাগেনা । আসলে মা-বাবা, ভাই টাই সবাই গ্রামের বাড়িতেই থাকেন। ওরা ঠিক এই পরিবেশে আসতে চান না কিংবা থাকতে চান না । বলে কিনা। " এত আলোর মধ্যে ঘুম হবে না ঠিক ।" আর আমার যা কিছু পৈত্রিক সম্পত্তি সব ভাইয়েরা এক কথায় জবরদখল করেই আছে । আমার স্ত্রী এই ব্যাপারটা একদমই মেনে নিতে পারেননি। উনিও উনিও গ্রামের যাতায়াত বন্ধ করে দিয়েছেন ।আর আমার মেয়েও গ্রামের পরিবেশ একদমই পছন্দ করেনা ।"
বাড়িতে মেয়ের টিউশন ,ছবি আঁকার্ ও গান শেখার মাস্টারমশাইরাই যাতায়াত করেন ।আমি বাড়ির বাইরেই পার্টী কিংবা উৎসব যা কিছু করার করি ।" ডাক্তার ব্যানার্জি বললেন ,"ও আচ্ছা ব্যাপারটা বুঝলাম । আচ্ছা চলি আজকে ,ভালো থাকবেন। "
এর পর ৫ বছর দেখতে দেখতে কেটে গেছে ।বাংলোর পরিবেশ এক কথায় বদলে গেল হঠাৎ করেই । তারপর প্রশান্তবাবু যকৃতের রোগে আক্রান্ত হলেন ।এক কথায় প্রথম পর্যায়ের সিরোসিস অফ লিভার । ধীরে ধীরে হাতে-পায়ে জল জমতে শুরু করল ,আর জন্ডিস তো আছেই । তিনি দুর্বল ও রোগে ভগ্ন প্রায় হয়ে পড়লেন ।
ভাগ্য সব সময় ছন্দে এবং সহায় হবে এ কথাটা কেউ হলফ করে বলতে পারে না ।প্রশান্ত বাবু কি ভেবেছিলেন তার জীবনে এরকম দুর্দিন নেমে আসবে। প্রশান্তবাবুর স্ত্রী স্বামীর শরীরের কথা চিন্তা করতে করতে একদিন হঠাৎই মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন। ব্যাস মাথা ফেটে চৌচির ।তার মেয়ে তাড়াহুড়ো করে গাড়িতে করে লোকাল এক সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেল এবং সেখানে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করে দিল । নিজের বাবা ও মা এইভাবে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যাওয়াতে প্রশান্তবাবুর মেয়ে নীলাঞ্জনা আকুল পাথারে পড়ল। কি করবে ভেবেই উঠতে পারছিল না । সঞ্চিত অর্থ ধীরে ধীরে কমে আসছ।।পড়াশোনা প্রায় লাটে উঠেছে। প্রসাদসম বাংলোতে যেন অন্ধকারের কালো ছায়া ঘিরে ধরল আস্তে আস্তে ।বাড়ির সব আলো আর ঠিকমতো জ্বলছে না।
সবাই ফিসফিস করে বলতে শুরু করল," কি থেকে যে কি হয়ে গেল সংসারটা ! কি সুন্দর সাজানো সংসার ছিল । " ছেলে বৌমার এই দুর্দশার কথা জানতে পারার পর থেকে প্রশান্তবাবুর মা ও বাবা ছেলেকে দেখতে আসলেন এবং থেকে গেলেন কয়েক দিন। ভাইয়েরাও একে একে দেখে গেলেন ওদের। যে যেভাবে পারল এই বিপদের দিনে পাশে দাঁড়াতে চেষ্টা করল ।প্রশান্তবাবু পৈত্রিক সম্পত্তি ভাইয়েরা বিক্রি করে দাদাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেন ।দিন সব সময় একই লয়ে চলে না। প্রশান্ত বাবু ভালো হাসপাতালে লাগাতার চিকিৎসার ফলে আস্তে আস্তে ভালো হয়ে উঠতে শুরু করলেন ।তাঁর স্ত্রীও এখন অনেক সুস্থ ।প্রশান্ত বাবু চিকিৎসকদের অশেষ ধন্যবাদ ও প্রশংসায় পঞ্চ মুখ সারাদিন । ভগবান রুপে তাঁরা তাকে চিকিৎসা করে সারিয়ে তুলেছেন সে কথা জনে জনে জানাচ্ছেন তিনি ।বেশ কয়েক মাস পরে প্রশান্ত বাবু অফিসে গেলেন ।ওর স্ত্রী কলা পেঁপের মাছের ঝোল রান্না করে খাওয়ালেন।মেয়ে আবারও পড়তে ও ছবি আঁকায় মন দিল। কিন্তু সবার মনেই একটা আশঙ্কা প্রশান্ত বাবু আবারো কোনো অসুবিধা না হয়। যাই হোক প্রশান্ত বাবুর বাড়িতে ধীরে ধীরে সব আলো গুলো আস্তে আস্তে জ্বলতে শুরু করলো ।আবারও ডাক্তার ব্যানার্জি সেদিন বললেন , "প্রশান্তবাবু সুস্থ হয়ে বাড়িতে আছেন শুনে ভালো লাগলো। আরো জানালেন ,কোন অসুবিধা হলে তাকে যেন জানানো হয়, " প্রশান্ত বাবু বললেন , "অবশ্যই, আপনি অনেক সাহায্য করেছেন তার জন্য চির কূতজ্ঞ আমি ।" ডক্টর ব্যানার্জি বললেন, " আরে না না ,এগুলো যদি আমি না করি তাহলে সার্জেন হলাম কেন ?আপনি ভালো থাকবেন ও খাওয়া দাওয়ার দিকে বিশেষ নজর রাখবেন সবসময় । নিয়মিত চেকআপ করাবেন তাহলেই ভালো থাকবেন ।চলি তাহলে আজকে, পরে আসবো আবারো কথা হবে "
প্রশান্ত বাবু ব্যালকনিতে বসে আজকের সকালের রোদ গায়ে লাগিয়ে খবরে কাগজ নিয়ে চা খেতে বসলেন । তাঁর বাগানের রং-বেরঙের ফ ফুলগুলো প্রশান্ত বাবুকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলল ।
ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ওই যে বললাম, দিন সব সময় সকলের সমান যায় না ।প্রশান্ত বাবুও আজকাল অনেক সামাজিক।
ডাঃ কাজল কুমার বক্সী
বগুলা, নদিয়া,
২৭/১১/২০২৫






