Tuesday, November 26, 2024

মুন ইউটিউবার

মুন কয়দিন ধরে ঠিক করতেই পারছেনা  যে, ইউটিউবে পরবর্তী কনটেন্ট টা কি হবে। অনেক চিন্তা ভাবনা করে মাথার মধ্যে একটা আইডিয়া আসলো যে, সে চাল কুমড়োর মোরব্বা তৈরি করবে এবার। যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। ওদের গোয়াল ঘরে টালির চালে কয়েকটা চাল কুমড়ো পেকে রয়েছে অনেক দিন। সাধারণত পাকা চাল কুমড়ো গুলো এই ভাবেই ঘরের চালে রেখে দেয়া হয়। সময়মতো ওগুলো পাড়া হয় বিভিন্ন কাজে।

মুন একটা বাঁশের  মই যোগাড় করে গোয়াল ঘরের টালির চালে সে নিজেই উঠে পড়ল। প্রায় ১০ কিলো ওজনের একটা ইয়া বড় পাকা সাদা চাল কুমড়ো কেটে দুই হাত দিয়ে তুলে কোলে নিলো। তারপর চাল কুমড়োটা সহ আস্তে আস্তে সে চালের থেকে নামতে শুরু করলো। কিন্তু ভীষণই দুর্ভাগ্য তার, হঠাৎ করে চাল কুমড়োটা হাত থেকে ফসকে টালির চালের পরে সজোরে পড়ে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গেই পট পট করে টালি গুলো ভেঙ ধম করে পড়লো চাল কুমড়োটা নিচে। মুন ও সঙ্গে সঙ্গে ব্যালেন্স না রাখতে পেরে ধপ করে গোয়াল ঘরের মধ্যে  করে পড়ে গেল।

মুন পড়ে যেতেই সে চিৎকার করতে শুরু করল ও বাবা ও মা আমাকে বাঁচাও আমি পড়ে গেছি দেখো ।আমার কি হয়েছে। হঠাৎ করে বিকট শব্দে ও মুনের চিৎকারে সবাই ছুটে আসলো আতঙ্কে। দেখলো মুন গোয়াল ঘরের মধ্যে পড়ে আছে। গায়ে রক্ত লেগে । আর কান্না করছে। বাড়ির সকলে মুনের পুড়ে যাওয়াতে হতভম্ব হয়ে গেল। তারা কি করবে ভেবে পাচ্ছিল না তৎক্ষণাৎ। কিছুক্ষণ পরে অবশ্য সম্বিত ফিরতেই তড়িঘড়ি করে মুনকে নিয়ে গেল হাসপাতালে। 

হাসপাতালে ভর্তি হতেই ডাক্তারবাবু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানালো আঘাত বেশ গুরুতর। সম্ভবত পা ফ্র্যাকচার ও হতে পারে। পরে ডাক্তারবাবুর নির্দেশ মতো মনের পা এক্স রে করানো হলো। এক্সরে তে দেখা গেল ডান পায়ের পাতার হাড়ে ফ্র্যাকচার ধরা পড়েছে। মুনকে নিয়ে যাওয়া হল ভালো নার্সিংহোমে। সেখানে মুনের ডান পায়ের প্লাস্টার করানো হলো। মুনকে ভর্তি করে রেখে সকলে একটু স্বস্তি পেল। 

প্রায় দুদিন পর মুনের শরীরটা একটু ভালো বোধ হল। শেষ পর্যন্ত স্বাভাবিক খাওয়া-দাওয়া শুরু করেছে। কিন্তু চোখমুখে এখনো ভয় এবং আতঙ্কের রেশ রয়ে গেছে। একে একে সবাই দেখতে আসছে তাকে। মুন ও টুকটাক তাদের সঙ্গে কথাও বলছে। মুনের যে মাথায় গুরুতর আঘাত লাগেনি এই কথা সকলেই বারে বারে বলতে লাগলো।।

বিকেল বেলার ভিজিটে মুনের মা তাকে দেখতে আসলে মুন মাকে বললো "মা তুমি আমার মোবাইলটা একটু এনে দেবে?" 
মা বললো "কেন রে? তুই এখন মোবাইল দিয়ে কি করবি "।
"তুমি বুঝতে পারছ না, এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল ফলোয়ারদের জানাতে হবে না? এমনিতেই অনেকে ফোন করছে। হয়তো। আমার এই অবস্থা জানলে তারা ভীষণই কষ্ট পাবে।

 আমাকে তাদেরকে একটু আশ্বস্ত করতে হবে ।আপডেট দিতে হবে।।"
মুনের মা বললো " মোবাইলটা আমার সঙ্গেই আছে তুই নিতে পারিস। সবকিছু হবে আগে তুই তাড়াতাড়ি একটু সুস্থ হয়ে নে। ভাঙা পা নিয়ে কতদিন ঘুরতে হবে কে জানে। কালকেই তোকে ছেড়ে দেবে ।এক সপ্তাহ পরে চেকআপে আবার আসতে হবে।"

এই নে তোর ফোন। এখন কাছে রেখে দে। 
কিছুক্ষণ মায়ের সঙ্গে কথাবার্তার পর ওর মা চলে গেল। 

মুন একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মোবাইলটা অন করলো। নিজের ইউটিউবের একাউন্ট খুলে রিল তৈরি করতে শুরু করলো। 
পোস্টে বললো, হাই গাইস, এই দেখো আমার কি অবস্থা হয়েছে ।তোমাদের জন্য চাল কুমড়ার মোরব্বা তৈরি করতে গিয়ে আমার এই হাল হয়েছে। মাথায় লেগেছে বুকে লেগেছে রক্ত বেরিয়েছে পা ভেঙেছে, অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম। প্রায় মর মর অবস্থা হয়েছিল আমার। ঠাকুরের ইচ্ছায় এবং আপনাদের আশীর্বাদ এবং ভালোবাসায় আমি এখনো বেঁচে আছি। আপনাদের অশেষ সহযোগিতা ও ভালোবাসা না থাকলে আমি আজ বেঁচে উঠতেই পারতাম না।। আমি খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে এবং আবারো আমি নিজেই টালির ছাদে উঠে চাল কুমড়ো পেড়ে ,চাল কুমড়ার মোরব্বা করে দেখা বই দেখাবো। 
আশাকরি আপনারা সকলে আমার পাশে থাকবেন আমাকে আশীর্বাদ করবেন যাতে করে আমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠতে পারি এবং তাড়াতাড়ি রিল তৈরি করতে পারি। যদিও সামনে আমার পরীক্ষা রয়েছে, জানি অনেক ক্ষতি হয়ে গেল কিন্তু চাল কুমড়োর মোরব্বা একটি অসাধারণ রেসিপি। এটাকে কখনোই অবজ্ঞা করা যায় না। হাই গাইস ,আজকে আর বেশি কথা বলবো না ,দেখতেই তো পাচ্ছ আমার কি অবস্থা !। সকলে ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন আর চাল কুমড়ো রেসিপির জন্য কোন পরামর্শ থাকলে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন।"
মুন তারপর এই আপডেট পোস্ট করে দিয়ে নিশ্চিন্তে চোখ বুজে ঘুমিয়ে পড়ল। 

পরেরদিন মুন সকালের চোখ মেলে দেখে, কাচের জানালা দিয়ে হুড় হুড় করে ভোরের আলো ঢুকছে তির্যক ভাবে। ঘুঘু ডাকছে এক নাগাড়ে। মনটা খুশিতে ভরে গেলো। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের প্লাস্টার লাগানো পা টা দেখেই ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো মুন। আজকে মুনের ছুটি হয়ে যাবে।
 সে বাড়ি ফিরে যাবে বিকালে। মুন বালিশের তলা থেকে নিজের মোবাইলটা বের করে তার অ্যাকাউন্টের আপডেট দেখতে শুরু করল। কিন্তু একি !এ তো দেখছি হাজার হাজার কমেন্টস। খুশিতে ভরে গেল তার মন। মোটামুটি কমেন্টসগুলোর সারমর্ম এই যে , ফলোয়ার  বলছেন, দিদি আপনি যত তাড়াতাড়ি পারুন সুস্থ হয়ে উঠুন ।আমরা আপনার পিছনে আছি, সবাইকে আমরা জানিয়ে দিয়েছি শেয়ার করে এই ব্যাপারটা। আমাদের সবুজ মুক্তি সংঘ এ ব্যাপারে একটা মিটিংও ডেকেছে। আপনার কোন সহযোগিতা লাগলে আর  ও অন্যকোন যেকোনো সাহায্য লাগলে আমাদের অবশ্যই জানাবেন। আমরা আপনার পিছনে সর্বদা আছি ।আপনি সুস্থ হয়েই আমাদের চাল কুমড়ো রেসিপি টা অবশ্যই বানিয়ে দেখাবেন। আপনি ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন। মুনদি জিন্দাবাদ ,আমরা আছি ও থাকবো। মুন তো কমেন্টগুলো পড়ে ভীষণই খুশি ।তার সব পা ব্যথা নিমেষেই উবে গেল।


এইভাবে প্রায় মন ২ মাস ধরে ডাক্তারবাবুর ওষুধ খেয়ে এক্সারসাইজ করে মোটামুটি সুস্থ হয়ে উঠলো। প্লাস্টার খোলা হয়ে গেছে কিছুদিন আগে ।এখন সে হাঁটাহাঁটি করতে শুরু করেছে। আর ভাবছে, কখন সে চাল কুমড়োর রেসিপিটা তৈরি করবে। চাল কুমড়ো রেসিপি তৈরি হয়ে গেলেই সে একটা আপডেট দেবে। 

মুন আপাতত বাজার থেকে একটা চাল কুমড়ো কিনে এনে চাল কুমড়ো মোরব্বা তৈরি করার মহড়া শুরু করল। চাল কুমড়ো গুলো ডুমো ডুমো করে কেটে, ফুটো ফুটো করে চুনের জলে ভিজিয়ে, পরিষ্কার করে চিনির জলে ভিজিয়ে মোরব্বার তৈরির প্র্যাকটিস করল। কিন্তু যতবারই সে মোরব্বা তৈরি করতে যাচ্ছে ততবারই মোরব্বা না হয়ে ঠিক জেলির মত হয়ে যাচ্ছে। বাজার থেকে যে ফেরিওয়ালার কাছ থেকে সে চাল কুমড়ার মোরব্বা এনেছিল তার মত হচ্ছে না। ভাবছি এরকম মোরব্বা বানালে তো আমাকেই সকলে ই উল্টোপাল্টা বলবে। 

যাইহোক বেশ কয়েকবার চেষ্টার পরে ফল মিলল। সে একদিন চাল কুমড়ার মোরব্বা রেসিপি নিজের একাউন্টে পোস্ট করল। 
চাল কুমড়ো রেসিপি দেখে তো হাজার হাজার ফলোয়ার্স আনন্দে আত্মহারা। হাজার হাজার কমেন্টস আসছে।

মুন আমাকে প্রায়ই বলতো, "ডাক্তার কাকু, আপনার কি ৫ ০০ ফলোয়ার্স হয়েছে ?আমার তো প্রায় ৫০ হাজার হতে চলল। "
আমি বললাম "দেখো মা ,আমি ফলোয়ার্সের আশা আর করি না এই মাঝেমধ্যে টুকটাক পোস্ট করি এই অব্দি। মুন এই কথা শুনে একগাল হেসে বলতো "হবে হবে ,আপনার হবে অনেক ফলোয়ার্স হবে একদিন। "

এর মধ্যে  হয়েছে কি , মুন কে নিয়ে কেউ রোস্ট করেছে যে  মুন নিজে আর টালির চালে উঠে চাল কুমড়ো পেড়ে আনেনি, বাজার থেকে মোরব্বা কিনে এনে সবাইকে দেখিয়েছে। আসলে মুন আমাদের সঙ্গে এক প্রকার প্রতারণায় করেছে। 


 এই রোস্ট দেখে,মুন তো খেপে লাল। সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা পোস্ট করল সে। এইভাবে পোস্ট তার পাল্টা পোস্ট চলল কিছু কিছু দিন।

কিছুদিন পরে মুন ভীষণই একটা বড় পোস্ট করল । 
বলল হাই গাইস, আজকে একটা বিশেষ খবর জানাবো তোমাদের।  তোমাদের সবাইকে অবাক করে দেবো। আমি আজকে আমার  ছোটবেলা থেকেই দেখা স্বপ্ন ও ইচ্ছা তাকে বিসর্জন দেব। আমি  আর ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখছি না। ওডিসি নাচ বাদ দিয়ে দিয়েছি। আমি এখন বড় ইউটিউবার হতে চাই। নানান ধরনের রেসিপি আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। যদিও মা আমাকে সব সময় বলতো, তুই বড় চাকরি করবি, কখনোই রান্নাবান্না করতে হবে না তখন। ভালো করে লেখাপড়া শেখো। আমি আর মায়ের কথা রাখতে পারলাম না। হাই গাইস ,এর জন্য আমাকে ক্ষমা করে দিও আমাকে তোমরা আগের মতই আশীর্বাদ ও ভালোবাসা দেবে। আমি এখন পুরনো বাড়িটা ছেড়ে নতুন বাড়ি কিনব বেহালায়। সেটাও তোমাদের আপডেট দেবো। তোমাদের সাপোর্ট আর ভালোবাসা না থাকলে আমি এই বাড়িটা কখনোই কিনতে পারতাম না মনে হয়। ভাগ্যিস আমার পা ট ভেঙে গেছিল।
 তাই জেদ এসেছিল যে আমাকে চাল কুমড়ো রেসিপি বানাতেই হবে।। আর এই জেদ আমাকে সাফল্যের চূড়ায় নিয়ে গেছে। চাল কুমড়ার মোরব্বা ভাইরাল হয়েছে। আপনারা থাকলে আমাকে আর ফিরে তাকাতে হবে না। দেখতেই তো পাচ্ছেন ডাক্তারি পড়ুয়ারা কিভাবে মার খাচ্ছে। কিভাবে অবহেলিত হচ্ছে । অধিকাংশ ডাক্তার বাবুরা কন্ট্রাকচুয়াল এ কাজ করেন। বছরের পর বছর তাদের কোন বেতনই বাড়ে না।সেই জন্য আর ডাক্তার হতে চাই না। চাল কুমড়া রেসিপিই ভালো। ওডিসি নাচ টা পায়ের ব্যথার জন্য আর করতেও পারবো না। আপনাদের জন্য সুখবর পরবর্তী আমার রেসিপি চালতা বেটে খুরমা চাটনি বানাতে হয় সেটা দেখাবো। আশা করি আপনারা ভিডিওটা দেখবেন। আজ এই অব্দি সকলে ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন। চাল কুমড়ো রেসিপি বাড়িতে বানিয়ে কেমন খেলেন জানাবেন।"

অনেক রাত্রে মুন এই পোস্টটা করে ঘুমিয়ে পড়ল। সারা আকাশ জুড়ে তারায় ভরে গেছে। নিস্তব্ধ রাত। মুনের জীবনের পুরনো স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হলেও নতুন স্বপ্নের সন্ধানে সে বিভোর। মুন যে একজন সফল ইউটিউবার । হাই গাইস ,ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

ডাঃ কাজল কুমার বক্সী
বগুড়া, নদীয়া 
২৬/১১/২০২৪









Saturday, November 16, 2024

নয়নতারা

এক যে ছিল এক গোয়ালিনী। তার তেমন কেউ ছিল না। থাকার মধ্যে ছিলএকটি কুকুর। তার  নাম বুকু।আর আছে দুটো গরু, নাম ধনু আর বুলু ।সে রোজ বিকেল বেলা  ঘরের জানালা খুলে ছোট্ট পুকুরের  বকের মাছ ধরা চেয়ে চেয়ে দেখতো এক মনে। গোয়ালিনীর নাম ছিল নয়নতারা দফাদার। রিংকু নয়নতারার বাড়িতে রোজ দুধ আনতে যেত। নয়ন তারা রিঙ্কুকে দেখলেই একগাল হাসিমুখে বলতো" কিরে রিংকু তুই দুধ খেয়েছিলি তো?রোজ তুই দুই পোয়া  করে দুধ খাবি আর বন্দুক নিয়ে যুদ্ধ করতে যাবি। জানিসতো  দুধ খেলে গায়ে খুব জোর হয় আর বুদ্ধিও বাড়ে "রিংকু এই কথা গুলো শুনলে একটু লজ্জা পেতো। মাথা নিচু করে হাসতো।তার পর  দুধ নিয়ে চলে যেত ধির  পায়ে। নয়ন তারার উঠোনের পাশে একটা বাতাবি লেবুর গাছ ছিল। ওই বাতাবি লেবুর গাছের সমস্ত ডালে ডালে ছোট ছোট সাদা ফুলে ভরে গেলে ফুলের গন্ধে বাড়িটা ম -ম করতো। মৌমাছি, কত রকমের প্রজাপতিরা দলে দলে উড়ে আসতো ।মধুর লোভে একেবারে মাতোয়ারা  হয়ে  যায় ।ইয়া বড় বড় বাতাবি লেবু গন্ডায় গন্ডায় ঝুলে ঝুলে থাকে। পাড়ার লোকেরা চেয়ে চেয়ে নিয়ে যায় মিষ্টি লেবুগুলো । নয়ন তারা মাঝে মধ্যেই উদাস হয়ে যায়। কেননা নয়নতারার স্বামী কয়েক  বছর হলো নিখোঁজ । কিছু বাড়তি পয়সার জন্য সে বোম্বাই গিয়েছিল কাজে। কিন্তু বছরখানেকের মাথায় ওর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি অনেক চেষ্টা চালিয়েও কোন সুরাহা হয়নি ।জলজ্যন্ত একটা মানুষটা কোথায় যে হারিয়ে গেল বোঝা গেল না ।নয়ন তারা এখনো তার ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকে, কত রকম সমস্যা ,ভয়ভীতি নিয়ে একা একাই বাড়িটা আগলে পড়ে আছে ।গ্রামের নানা জনের নানানরকম কথা, কুঁচাউনি বাঁচিয়ে গরু দুটো আর কুকুরটা নিয়ে বেঁচে আছে। 

রিংকু একদিন সত্যি সত্যিই দৌড়ঝাঁপ ,পড়াশোনা করে চাকরিতে জয়েন করলো।  সংবাদ শুনে নয়ন তারার তো  প্রায় পাগলের মতো অবস্থা। কখনো হেসে হেসে, কখনো কেঁদে কেঁদে সারা গ্রামের লোকের কাছে রিংকুর চাকরির কথা বলতে লাগলো ।আর তার গরুর দুধের সুখ্যাতির কথা জনে জনে ডেকে ডেকে জানালো। তার গরুর দুধ যারাই খেয়েছে তারাই নাকি ভালো আছে ভালো কিছু করছে। আর রিঙ্কু তো বড় চাকরিই পেয়ে গেছে। নয়ন তারা নিজে পায়েস রান্না করে রিংকুর বাড়িতে দিয়ে এসেছিল। দু-একদিনের মধ্যেই রিংকুর ধানবাদে যাবে নতুন চাকরিতে জয়েন করতে। 

নয়ন তারা তার গরু দুটো আর কুকুরটাকে নিয়ে সারাদিন খুবই ব্যস্ত থাকে। এরই মধ্যে চলে গেছে দু-তিনটি বছর। প্রায় তিন -চার বছর পরে রিংকু তাঁর দল বল ঝাড়খন্ড সীমান্তে কয়েকজনকে কি কারনে পাকড়াও করেছিল। রিঙ্কুকে দেখেই তাদের মধ্যে একজন কেমন যেন এক দৃষ্টিতে বড় বড় চোখ করে চেয়েছিল অনেকক্ষণ। রিংকু প্রথমে পাত্তা না দিলেও লোকটা ঐরকম অনেকক্ষণ ধরে চেয়ে আছে কেন ভাবতে লাগলো। লোকটার মুখে দাড়ি ভর্তি ।বেশ বড়সড়ো চেহারা, নাম বলেছে মোস্তাক্, বাড়ি বিহারে কিন্তু লোকটাকে খুবই চেনা চেনা লাগছে তার কাছে কিন্তু মেলাতে পারছে না কিছুতেই কারো সঙ্গে। রিঙ্কু অতি উৎসাহে তাকে বারে বারে জেরার পর প্রায় দিনের শেষে জানতে পারলো তার আসল পরিচয় ।সব কিছু জানার পরে সে তো থ বনে গেল ।,কি করবে ভেবে পাচ্ছিল না ।হাসবে না কাঁদবে না লাফাবে কোন কিছুই ভাবতে পারছিল না ।যাইহোক দাঁতে দাঁত চেপে সেদিন বিকেলেই নয়ন তারার কাছে সংবাদ দেয়া হলো যে তার স্বামীর খোঁজ পাওয়া গেছে । উনি যেন অবশ্যই ঝাড়খন্ডে চলে আসে, নিচে ঠিকানায়। সঙ্গে যেন কাউকে নিয়ে আসে্ন‌। নয়ন তারা তার স্বামীর খোঁজ পাওয়া গেছে শুনে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেনি ।সে যেন হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়ল কিন্তু রিংকুর কথা  অবিশ্বাস করবে বা কি করে ?প্রায় অজ্ঞান হয়েই শুয়ে পড়লো সে মাটিতে ।গ্রামের লোকেরা মাথায় জল টল দিয়ে ওকে সুস্থ করে পরের দিন ঝাড়খন্ডে যাওয়ার ব্যবস্থা করল। রিঙ্কু চাকরি করতে এসে নয়নতারা স্বামীকে যে সে খুঁজে পাবে সে কথা কখনো ভাবতেই পারেনি ।আজ বড্ড আনন্দের আর খুশির দিন কিন্তু নয়নতারা স্বামী কি কারনে বোম্বাই থেকে সোজা ঝাড়খন্ডে এসে চোরা চালানোর সঙ্গে যুক্ত  হল সেটা জানতে হবে তাকে। কতদিন বা জেল খাটতে হবে এরজন্য সে জানেনা।

নয়নতারা ঝাড় খন্ডে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে রইল সারাদিন ।সারারাত্রি ঘুম হয়নি চিন্তায় চিন্তায়। খুব ভোরে উঠেই ব্যাগ পত্র গুছিয়ে পাড়ার একটা ছেলেকে নিয়ে ঝাড়খন্ডে যাওয়ার জন্য স্টেশনের দিকে রওনা দিল। পাশের বাড়ির বৌদিকে বলে গেল ধলু আর বুলুকে  দেখতে। টিকিট কেটে নির্দিষ্ট সময়ে ট্রেনে উঠে পড়ল দুইজন।। কিছুতেই যেন সময় কাটছে না ।কখন আসবে ঝাড়খণ্ডের সেই জায়গায় যেখানে তার স্বামীকে পাওয়া গেছে। রিঙ্কু অপেক্ষা করছে তার জন্য। বলা আছে কোথায় তাকে নামতে হবে কোথায় যেতে হবে। একটা সময় পরে রিংকু ও গ্রামের ছেলেটা সেই জায়গায় পৌঁছে গেল। আনন্দে উত্তেজনায়, আশঙ্কায় তার গায়ে কাঁটা

 দিতে লাগলো। থরথর করে কাঁপছে যেন শরীরের ।পা যেন কিছুতেই নড়তে চাইছে না। তবুও কষ্ট করে সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখতে পেল একটা লোক বিএসএফের গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছে।। রিংকু নয়নতারা কে দেখে এক দৌড়ে  কাছে   এসে বলল" এসো এসো পিসি দেখো কে এসেছে? কাকে ধরে নিয়ে এসেছি। নয়নতারা চোখের জল ধীরে ধীরে অতি কষ্টে চেপে সেই লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। রিঙ্কু বলল" দেখো চিনতে পারছো কিনা। নয়ন তার স্বামীকে দেখেই চিনতে পারল কিন্তু এ কি চেহারা হয়েছে ।তা ছাড়া মুখে দাড়ি বড় বড় ।জামা লুঙ্গি পরা। নয়ন তারা স্বামী শুভ দফাদার স্ত্রীকে দেখে এক নিমেষে চিনতে পারল। মাথা নিচু করে বসে পড়ল মাটিতে ।চোখ দিয়ে জল বেরোচ্ছে কিন্তু কিছুই বলছে না। নয়নতারা বললে" তুমি এতদিন কোথায় ছিলে? কি করছিলে? কেন খোঁজ দাও নি আমার কোন খোঁজ নাওনি কেন ?আমার কি অবস্থা তুমি জানলে তুমি এভাবে থাকতে পারতে না। এখন কি হবে আমার। "

রিঙ্কু বলল" পিসি এখনই পিসেমশাই কে তুমি পাবে, না ওকে থানায় যেতে হবে। ওখানে নিয়ম-কানুন মেনে ওকে কিছুদিন থাকতে হতে পারে। তারপর আমি যা করার করব ও তো এখানে গরু চোরা চালানে যুক্ত ছিল ।পশ্চিমবঙ্গে গরু চোরাকারবারি রমরমা। সেই লোভে এদের সঙ্গে মুম্বাইয়ে যোগাযোগ হয়েছিল। অতিরিক্ত পয়সার লোভে এদের সঙ্গে ভিড়েছে গরু চোরা চালানে। আমাদের কাছে খবর ছিল । তাই ওদেরকে ধরতে পেরেছি কিন্তু এখন দেশের আইন মেনে ওকে থানায় নিয়ে যেতে হবে। 

এই কথা শুনে নয়নতারা হাউ হাউ করে কাঁদতে শুরু করল। রিঙ্কুকে হাতে-পায়ে ধরল। তুমি যত তাড়াতাড়ি পারো ওকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা কর ,না হলে আমি এখান থেকে কিছুতেই যাব না। রিঙ্কু তাঁর  অফিসারদের সঙ্গে কথা বলল। তারা বলেছেন ব্যাপারটা তারা দেখবে, যাতে ও তাড়াতাড়ি ছাড়া পায়। নয়নতারা ও তার স্বামীর সঙ্গে তেমন কিছু কথা হলো না ।কেউ কোন কথাই বলতে পারছে না ভালো করে ।কেবল একে অন্যের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে। 

কিছুক্ষণ পর ওরা সবাই গাড়িতে করে লোকাল থানায় চলে গেল।.সঙ্গে নয়নতারা। থানায় ওদের হ্যান্ড ওভার করে রিংকু নয়নতারা কে নিয়ে দ্রুত কোয়াটারে চলে আসলো। সারাদিন তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে ভালো খেতে দিয়ে আশ্বস্ত করলো যে তার স্বামীকে অর্থাৎ পিসেমশাইকে তাড়াতাড়ি ছাড়ানো ব্যবস্থা করবে সে। 

রিংকু তার পুরনো কথাগুলো নয়নতারা কে শোনালো। বলল "তুমি তো বলেছিলে, আমি যুদ্ধে যাব বন্দুক ্নিয়ে। আমার কাছেই দেখো রাইফেল আছে ।তোমাকে দেখাচ্ছি। আমি দেশ পাহারা দিই। আমার সঙ্গে অনেকে থাকে । অনেক মেয়ে আছে। তোমার দুধ না খেলে আমি এখানে আসতেই পারতাম না। তুমি আমার আপন পিসি না হলেও অনেক বড়। এখানে তুমি দু-একদিন থেকে তারপরে বাড়িতে যেও।" নয়ন তারা কাঁদতে কাঁদতে বলল "আমি যে ওকে খুঁজে পেয়েছি এটাই যথেষ্ট কিন্তু আমি এখানে থাকবো কি করে? আমার যে দুটো গরু আছে একটা কুকুর আছে । পাড়ার বৌদির কাছে রেখে এসেছি ।তাদের তাদেরকে কে খাওয়াবে ?কে দেখবে। তুমি শুধু ওকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা কর যত সম্ভব তাড়াতাড়ি। ও যাতে বাড়ি ফিরে যেতে পারে। আমি কালকে ভোরেই রওনা দেব বাড়ির উদ্দেশ্যে।" নয়নতারা স্বামী শুভ দফাদার। নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত সে কিন্তু সে ভালোভাবেই বুঝতে পারছে যে তাকে কিছুদিন জেল খাটতেই হবে। সেও এখন বাড়ি যাওয়ার জন্য উদগ্রীব ভয়ে পড়েছে। নয়ন তারাকে দেখে সে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছে না। 

নয়নতরা বাড়ি যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠলো । তার গরু দুটোর জন্য ধলু আর বুলু। ভোর হতে না হতেই বেরিয়ে পড়ল ট্রেন ধরার জন্য সেই ছেলেটিকে নিয়ে। তার আগের দিন স্বামীকে দেখে এসেছে একবার। রিঙ্কু স্টেশনে এসেছিল তাকে ছাড়তে। নয়ন তারা তাকে বলল  রিঙ্কু তুমি বাড়ি চলে এসো তোমার পিসে মশাইকে কে নিয়ে তাড়াতাড়ি ।তোমার জন্য আমরা অপেক্ষায় থাকবো।। কালো গরুর দুধ দিয়ে পায়েশ রান্না করে রাখবো। এই কথা বলে সে ট্রেনে উঠে বসলো। বলল রিঙ্কু তুমি দেশের জন্য লড়াই করবে যুদ্ধ করবে আমরা তোমার পিছনে আছি। আমার স্বামীকে খুঁজে দেয়ার জন্য তোমাকে অশেষ ধন্যবাদ ও আমার আশীর্বাদ রইল ।তুমি একদিন আরো বড় হবে। হর্ন বাজিয়ে ট্রেন ছেড়ে দিল। নয়নতারা আঁচল দিয়ে মুখ ঢাকল।রিংকু আর দেখতে পেল না নয়ন তারা কে। দুরন্ত গতিতে একটা মাল ট্রেন স্টেশন দিয়ে পাস হতেই স্টেশনের যত কাক ও শালিক তারা বাসায় উড়ে চলে গেল। সারা স্টেশন জুড়ে এখন শুধু নিস্তব্ধতা ও শূন্যতা । 





ডাঃ কাজল কুমার বক্সী     

বগুলা 

নাদিয়া১৫/১১/২০২৪

























 

তোমার কাছে

🎕🎕  তোমার কাছে বসবো নাতো আর, এই কথাটাই বলছি বারং বার। আমের মুকুল যতই পড়ুক ঝরে-- যতই হানো কঠিন তিরস্কার।              তোমার কাছে বসবো নাতো ...